| শিরোনাম |
|
ইসলামী ব্যাংক, শরিয়াহর আলোকে এক নির্মোহ পর্যালোচনা
জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান
|
![]() ইসলামী ব্যাংক, শরিয়াহর আলোকে এক নির্মোহ পর্যালোচনা এই প্রেক্ষাপটে ইসলামী ব্যাংকিং কেবল একটি আর্থিক ব্যবস্থা নয়, বরং সুদমুক্ত অর্থনীতির স্বপ্ন বাস্তবায়নের একটি প্রয়াস। বাংলাদেশে সেই প্রয়াসের সবচেয়ে বড় প্রতীক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের কার্যক্রমের ভিত্তি প্রচলিত সুদভিত্তিক ঋণচুক্তি নয়, বরং মুরাবাহা, মুশারাকা, মুদারাবা, ইজারা, বাই-মুয়াজ্জাল, সালাম ও ইস্তিসনার মতো শরিয়াহস্বীকৃত চুক্তি। অর্থাৎ ঘোষিত কাঠামো, প্রণীত নীতিমালা এবং পরিচালনাগত দলিলপত্রের বিচারে ব্যাংকটি ইসলামী ব্যাংকিং মডেলের অন্তর্ভুক্ত। আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমি, ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হিসাব ও নিরীক্ষা সংস্থা (এএওআইএফআই), ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের শরিয়াহ স্ট্যান্ডার্ড এবং সমকালীন অধিকাংশ ফকিহ এই ধরনের কাঠামোকে নীতিগতভাবে বৈধ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তবে এখানেই আলোচনার সমাপ্তি নয়, বরং এখান থেকেই গভীরতর বিশ্লেষণের সূচনা। ইসলামী অর্থনীতির মূল দর্শন কেবল সুদ বর্জন নয়, বরং ঝুঁকি ভাগাভাগি, প্রকৃত বাণিজ্য, সম্পদভিত্তিক লেনদেন, ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা এবং মুনাফা অর্জনের সঙ্গে দায়বদ্ধতার সমন্বয়। ইসলামী অর্থব্যবস্থার আদর্শ কাঠামোয় মুশারাকা ও মুদারাবার মতো অংশীদারিত্বভিত্তিক মডেলকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আধুনিক ইসলামী ব্যাংকিং, বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে, মূলত মুরাবাহা ও বাই-মুয়াজ্জালভিত্তিক অর্থায়নের ওপর অধিক নির্ভরশীল। এই বাস্তবতা নিয়ে সমকালীন ইসলামী অর্থনীতিবিদদের মধ্যেও আলোচনা রয়েছে। মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী, ড. মুহাম্মদ উমর চাপরা, ড. নেজাতুল্লাহ সিদ্দিকীসহ বহু গবেষক লিখেছেন যে বর্তমান ইসলামী ব্যাংকিং শরিয়াহসম্মত হলেও তা ইসলামী অর্থনীতির চূড়ান্ত ও পরিপূর্ণ রূপ নয়। বরং এটি সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা থেকে শরিয়াহভিত্তিক অর্থনীতির দিকে অগ্রসরমান একটি রূপান্তরধর্মী কাঠামো। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই মূল্যায়ন প্রযোজ্য। প্রকাশ্য নীতিমালা, শরিয়াহ বোর্ড, চুক্তিপদ্ধতি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের বিচারে ব্যাংকটিকে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক বলা হয়। কিন্তু ইসলামী অর্থনীতির আদর্শিক মানদণ্ডে শতভাগ পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহ অর্থনীতির প্রতিচ্ছবি বলার ক্ষেত্রেও সংযম অবলম্বন করা হয়। কারণ আধুনিক রাষ্ট্রীয় ব্যাংকিং কাঠামো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা এবং বাস্তব বাণিজ্যিক সীমাবদ্ধতা ইসলামী ব্যাংকিংকে বহু ক্ষেত্রে আপসকামী বাস্তবতার মধ্যে পরিচালিত হতে বাধ্য করে। শরিয়াহর আলোকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো লেনদেনের প্রকৃতি। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে সুদের ভিত্তিতে অর্থ ঋণ দেয় না, বরং সম্পদভিত্তিক ও শরিয়াহস্বীকৃত চুক্তির মাধ্যমে অর্থায়ন পরিচালনা করে। এই কারণেই মূলধারার আহলুস সুন্নাহর অধিকাংশ সমকালীন ফকিহ, আন্তর্জাতিক ফিকহ পরিষদ এবং ইসলামী অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা এর লেনদেনকে সুদী ব্যাংকের লেনদেনের সমতুল্য মনে করেন না। তবে একই সঙ্গে শরিয়াহ গবেষকদের একটি অংশ অধিকতর শক্তিশালী শরিয়াহ অডিট, স্বচ্ছতা, প্রকৃত অংশীদারিত্বমূলক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কাগুজে লেনদেনের পরিবর্তে বাস্তব সম্পদভিত্তিক অর্থায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে আসছেন। কারণ ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সফলতা কেবল সুদের বিকল্প শব্দ প্রয়োগে নয়, বরং ইসলামের অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার বাস্তবায়নের মধ্যেই নিহিত। ফিকহি ও গবেষণাগত মূল্যায়নের ভাষায় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশকে সুদভিত্তিক প্রচলিত ব্যাংকের কাতারে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। একই সঙ্গে ইসলামী খেলাফতের যুগে কল্পিত পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহ অর্থব্যবস্থার নিখুঁত প্রতিরূপ বলেও বিবেচনা করা হয় না। বরং এটিকে সমকালীন বাস্তবতায় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের একটি স্বীকৃত, বৈধ এবং উন্নয়নশীল মডেল হিসেবে দেখা হয়। অতএব, ন্যায়নিষ্ঠ ও গবেষণাভিত্তিক মূল্যায়নে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের কার্যক্রমকে শরিয়াহসম্মত ব্যাংকিং কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত বলা হয়, তবে ইসলামী অর্থনীতির সর্বোচ্চ আদর্শিক স্তরে পৌঁছানোর জন্য অধিকতর স্বচ্ছতা, অংশীদারিত্বভিত্তিক অর্থায়ন এবং শরিয়াহ তদারকির উন্নয়নকে এখনও প্রয়োজনীয় বলে গণ্য করা হয়। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বর্তমান বাস্তবতা তাই পূর্ণ অস্বীকৃতি কিংবা নিখুঁত পরিপূর্ণতার দাবির মাঝামাঝি নয়, বরং শরিয়াহর স্বীকৃত নীতিমালার আলোকে পরিচালিত একটি বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা, যা ক্রমাগত পরিশুদ্ধি ও উন্নয়নের পথে অগ্রসরমান। লেখক কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো, মিশর mdraiyan6790@gmail.com |