শুক্রবার ১২ জুন ২০২৬ ০২:০৬:৫৬ এএম
শিরোনাম আজীবন সম্মাননা পেলেন বগুড়ার কৃতি সন্তান প্রফেসর ড. আজহারুল ইসলাম       র‍্যাব-৯ এর অভিযানে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর থেকে মাদ্রাসা ছাত্রী অপহরণ মামলার প্রধান আসামি গ্রেফতার ও ভিকটিম উদ্ধার       বিএনপি দেশের মানুষের জন্য কাজ করে ---বগুড়া জেলা পরিষদের প্রশাসক জাকির       কুড়িগ্রামে চরাঞ্চলে প্রান্তিক নারীদের মাঝে ব্র্যাকের হাঁসের বাচ্চা বিতরণ ও প্রশিক্ষণ        বাজেট ২০২৬-২৭ : মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য সরকারের       ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ পিরোজপুরে       বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আরও ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে — যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন      
পরিচ্ছন্ন ঈদ নগরী গঠনে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: প্রসঙ্গ ঢাকা মহানগর
খোন্দকার মাহ্‌ফুজুল হক
Published : Monday, 25 May, 2026
পরিচ্ছন্ন ঈদ নগরী গঠনে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: প্রসঙ্গ ঢাকা মহানগর
ঈদ মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবগুলোর একটি। বাংলাদেশে ঈদ শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি সামাজিক সম্প্রীতি, পারিবারিক মিলনমেলা এবং আনন্দের উৎস। বিশেষ করে ঈদুল আজহা।

এ সময় কোরবানির পশু জবাইকে কেন্দ্র করে নগরজীবনে উৎসবের সাথে সাথে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সৃষ্টি হয়। পশুর রক্ত, নাড়িভুঁড়ি, চামড়ার উচ্ছিষ্টাংশ, প্লাস্টিক, খাদ্যবর্জ্য এবং প্যাকেজিং সামগ্রী মিলিয়ে শহরজুড়ে এক ধরনের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে ঈদুল ফিতরেও খাদ্য ও প্লাস্টিকজাত বর্জ্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

একটি পরিচ্ছন্ন ঈদ নগরী গঠনের জন্য কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যবস্থাপনায় সরকারের পাশাপাশি নাগরিকদেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে। শুধু সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার ওপর নির্ভর করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বরং নাগরিক সচেতনতা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই একটি স্বাস্থ্যকর নগর পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।

 নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বর্তমান বাস্তবতা

বাংলাদেশের বড় শহরগুলো বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনায় ঈদের সময় বর্জ্যের পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ঈদুল আজহার সময় রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার টন অতিরিক্ত বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এ বিপুল পরিমান বর্জ্য দ্রুত অপসারণ করা না গেলে দুর্গন্ধ, জলাবদ্ধতা, রোগজীবাণুর বিস্তার এবং পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি বাড়ে। বর্তমানে সিটি করপোরেশনগুলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোরবানির বর্জ্য অপসারণের উদ্যোগ নিলেও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পর্যাপ্ত যানবাহনের অভাব, জনবল সংকট, অসচেতন নাগরিক আচরণ এবং অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ফেলার কারণে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক সময় মানুষ রাস্তার পাশে, ড্রেনে কিংবা খোলা স্থানে বর্জ্য ফেলে রাখে, যা নগর ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তোলে।

 ঢাকা মহানগরীতে ঈদকালীন বর্জ্যের প্রকৃতি
ঢাকা মহানগরী বাংলাদেশের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। প্রায় দুই কোটিরও বেশি মানুষের বসবাসের এ নগরীতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয়। ঈদুল আজহা এলে সে বর্জ্যের পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কোরবানির পশুর রক্ত, বাজার ও হাটের আবর্জনা, নাড়িভুঁড়ি, চামড়া, প্লাস্টিক, খাদ্যবর্জ্য ও বাজারের আবর্জনা মিলিয়ে নগরজীবন এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। ফলে পরিচ্ছন্ন ঈদ নগরী গঠনে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
 
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি নির্ভর ও দ্রুত বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থার দিকে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। নাগরিক অংশগ্রহণ, আধুনিক প্রযুক্তি, অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থা এবং ওয়ার্ডভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে সমন্বয় করে দুই সিটি কর্পোরেশন “ক্লিন ঈদ সিটি” ধারণাকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।
 
ঈদকালীন বর্জ্যের পরিবেশগত ঝুঁকি

ঈদুল আজহার সময় ঢাকায় কয়েক লাখ পশু কোরবানি হয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে হাজার হাজার টন জৈব বর্জ্য জমা হয়। এসব বর্জ্য দ্রুত অপসারণ না হলে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়, ড্রেনেজ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, মাছি-মশার প্রজনন বৃদ্ধি পায়, ডায়রিয়া, ডেঙ্গু ও চর্মরোগের ঝুঁকি বাড়ে, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। এসব বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে জনস্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
 
ঈদে বর্জ্য বৃদ্ধির কারণ

ঈদকে কেন্দ্র করে বর্জ্য বৃদ্ধির পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হলো কোরবানির পশুর বর্জ্য। ঈদুল আজহায় পশুর রক্ত, হাড়, চর্বি ও নাড়িভুঁড়ি বিপুল পরিমাণে জমা হয়। সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও অপসারণ না করলে এগুলো থেকে দুর্গন্ধ ও জীবাণুর সৃষ্টি হয়।

এছাড়াও খাদ্যবর্জ্য এ সময় বেড়ে যায়। ঈদের সময় বাড়িতে অতিরিক্ত রান্না, অতিথি আপ্যায়ন ও অনুষ্ঠান আয়োজনের কারণে খাদ্য অপচয় এবং খাদ্যবর্জ্য বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং সামগ্রীর ব্যবহার অন্য সময়ের তুলনায় বেশি হয়। বাজারজাত পণ্য, উপহারসামগ্রী, অনলাইন ডেলিভারি এবং ডিসপোজেবল প্লেট কাপ ব্যবহারের ফলে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণও বেড়ে যায়।

 নাগরিক সচেতনতারও অভাব দেখা দেয় এ সময়ে। অনেক নাগরিক পশুর ও অন্যান্য সৃষ্ট বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে না ফেলে খোলা জায়গায় ফেলে দেন। এতে পরিবেশ দূষণ আরও বৃদ্ধি পায়।

বর্জ্য অপসারনে গৃহীত পদক্ষেপ
কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর বাংলাদেশের শহর ও নগরাঞ্চলে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সৃষ্টি হয়। পশুর রক্ত, নাড়িভুঁড়ি, হাড়, চর্বি ও অন্যান্য জৈব বর্জ্য দ্রুত অপসারণ করা না গেলে পরিবেশ দূষণ, দুর্গন্ধ এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই প্রতিবছরের ন্যায় এবারও সরকার কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে সারা দেশে এবং বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় বর্জ্য অপসারণে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বর্জ্য অপসারণ করে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর নগর পরিবেশ নিশ্চিত করা।

সরকার আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর বর্তমানে বিশেষ জোর দিচ্ছে। সরকার বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রযুক্তি নির্ভর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সরকারের নতুন উদ্যোগের অংশ। দেশেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সরঞ্জাম তৈরির সম্ভাবনাও যাচাই করা হচ্ছে। এছাড়া ইলেকট্রিক যান ব্যবহার করে বর্জ্য পরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

জনসচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। মসজিদের ইমামদের খুতবার আগে কোরবানির বর্জ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি নাগরিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগ ২০২৬ সালের ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের সব সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে। কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণের জন্য অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী, যানবাহন এবং জীবাণুনাশক সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার সারাদেশে অস্থায়ী বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন এবং নির্ধারিত স্থানে পশু জবাইয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তদারকি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে কোথাও বর্জ্য জমে না থাকে।

প্রসঙ্গ: ঢাকা মহানগর

ঈদুল আজহা ২০২৬ উপলক্ষে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন আগাম প্রস্তুতিমূলক সভা আয়োজন করেছে এবং দ্রুত বর্জ্য অপসারণে একাধিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ আলোকে ওয়ার্ডভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন, অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ এবং বিশেষ মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।


কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন । প্রায় ২০ হাজারের বেশি পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং বর্জ্য অপসারণের জন্য অতিরিক্ত ট্রাক, প্লাস্টিক ব্যাগ ও বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া হটলাইন চালু করা হয়েছে, যাতে নাগরিকরা বর্জ্য অপসারনের তথ্য ও অভিযোগ দ্রুত জানাতে পারেন। পরিচ্ছন্ন ঈদ নগরী গঠনে দ্রুত বর্জ্য অপসারণ, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সহায়তার মতো বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন “গ্রিন সিটি, ক্লিন সিটি” কর্মসূচির আওতায় আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খাল পুনরুদ্ধার এবং মশক নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এ লক্ষ্যে পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল এলাকাকে “রিসোর্স সার্কুলেশন পার্ক”-এ রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যেখানে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সার উৎপাদনের ব্যবস্থা থাকবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ কমানোর পাশাপাশি পুনর্ব্যবহারযোগ্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
 

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে দশটি জোনে কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণের জন্য প্রশিক্ষিত কসাই মোতায়েন, দশটি বর্জ্য পরিদর্শন দল গঠন, অতিরিক্ত ডাম্পার-ট্রাকসহ যানবাহন বরাদ্দ, আমিনবাজার ল্যান্ডফিল এলাকা প্রস্তুত রাখা এবং বিভিন্ন ওয়ার্ডে স্বেচ্ছাসেবক টিম নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের লক্ষ্য ঈদের দিন নগরে সৃষ্ট বিপুল পরিমাণ বর্জ্য দ্রুত ও নিরাপদে অপসারণ করা। নাগরিকদের উৎসেই বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে উদ্বুদ্ধ করা, অবাধ্য পরিবেশ দূষণকারীদের আইনগতভাবে দমন করা, ২৪ ঘণ্টার কল সেন্টার ও নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু রেখে নজরদারি করা এবং সংগ্রহ নিক্ষেপ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।

সকল প্রশাসনিক জোনে মাংস প্রস্তুতকারী (কসাই) নির্বাচন করে তাদেরকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কোরবানি শুদ্ধভাবে সম্পন্ন করতে এবং পশুর দেহ থেকে দ্রুত চামড়া ছাড়িয়ে ফেলা ও সঠিকভাবে কাট ছাঁট করে নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলতে কসাইদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে নিপুণতা বাড়বে, বর্জ্য অপসারণে গতি আসবে এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি কমবে।

 প্রতিটি জোনে ম্যনেজমেন্ট মনিটরিং টিম বা পরিদর্শন দল থাকছে যারা  ঈদুল আযহা চলাকালীন বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম তদারকি করবে। অতিরিক্ত যানবাহন যেমন; অতিরিক্ত ডাম্পার ট্রাক ও পিকআপ ভ্যান প্রস্তুত রাখা হবে, যাতে ঈদের পর তিন দিনের মধ্যে নগরীর সমস্ত বর্জ্য অপসারণ নিশ্চিত করা যায়। ডাম্পিং এলাকা প্রস্তুতি তথা ঈদের বর্জ্যগুলির দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে বিশেষ ডাম্পিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি এবং দুটি গভীর খননকৃত গর্ত (ট্রেঞ্চ) প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে ১৫-২০ জন স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করে পরিচ্ছন্নতা প্রচারণা ও বর্জ্য সংগ্রহে সহায়তা করা হবে। তাদের জন্য বিশেষ পোশাক ও পরিচয় পত্র সরবরাহ করা হবে।

ডিএনসিসি’র পূর্বের অভিজ্ঞতার আলোকে কর্মী ও যানবাহন প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। ২০২৫ সালের ঈদে ঢাকা উত্তর সিটিতে প্রায় ১০৪৩১ জন পরিচ্ছন্নকর্মী কাজ করেছে। এবারও সমসংখ্যক কর্মী নিয়োজিত থাকছে। ডিএনসিসি ২০২৫ সালে ২০,০০০ টন বর্জ্য অপসারণ করতে ৮৫০টির মতো যানবাহন ব্যবহার করেছিল; এবারও কমপক্ষে সমপরিমাণ বা তার বেশি যানবাহন লাগবে। তাই এবছরও গতবারের ন্যায় প্রায় ২২৪টি ডাম্পার ট্রাক, ৩৮১টি পিকআপ ভ্যান এবং কয়েকডজন পাইলোডার মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এছাড়া নিরাপদ পরিবহণের জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডের জন্যই আলাদা ট্রেন্ডার (হালকা গাড়ি) প্রয়োজন হতে পারে বিধায় তা সংগ্রহ করা হবে। নির্মাণ শ্রমিক, অপারেটর, যোগাযোগকর্মী ইত্যাদি মিলিয়ে বাড়তি মানবশক্তি থাকছে। সংস্থান হিসেবে ডিএনসিসি প্রধানত স্থানীয় ঠিকাদার ও পরিচ্ছন্নতা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করবে। ড্রাইভারদের  ছুটি বাতিল ও শিফটে কাজ করার ব্যবস্থা থাকবে। এজন্য প্রয়োজনে বাড়তি ভাতা দেওয়া হতে পারে। ইঞ্জিন সচল রাখার জন্য জ্বালানি ও যন্ত্রাংশের যোগান নিশ্চিত করা হবে।

 আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে বর্জ্য অপসারণের জন্য স্বতন্ত্র প্ল্যাটফর্ম তৈরি এবং কোরবানির হাট ও বড় বাজারগুলো থেকে দ্রুত পৌঁছানোর সুবিধা নিশ্চিত করতে ট্রেঞ্চ খনন কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। এতে মিশ্রণ সংকট এড়ানো যাবে। সময়মতো বর্জ্য রাখতে না পারলে পরিবেশ দূষণ বাড়ে; তাই খোলা ট্রেঞ্চ এবং অঙ্গুল ধরা জায়গাগুলো আগে থেকে সাঁটানো থাকবে।

জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রশাসকের বাণী সম্বলিত লিফলেট এবং মাইকিং এর মাধ্যমে প্রচার চালানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের ডিজিটাল বিলবোর্ড এ কোরবানির বর্জ্য অপসারণ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন প্রচারিত হবে। কোরবানির বর্জ্য অপসারণ বিষয়ে যাতে করে জনগণ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে, এজন্য মসজিদের ইমামগণকে এ বিষয়ে জুমার খুতবায় আলোচনা পেশ করানোর ‌উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পলিব্যাগ ব্লিসিং পাউডার এবং অন্যান্য মালামাল বিভিন্ন অঞ্চলে বিতরণ করা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বর্জ্য অপসারণ সংক্রান্ত প্রশাসকের ভয়েস মেসেজ নগরবাসীদের মোবাইলে প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার ফলে প্রত্যেক নগরবাসী বর্জ্য অপসারণ সংক্রান্ত সরাসরি প্রশাসকের পক্ষ থেকে তথ্য লাভ করতে সক্ষম হবেন।

মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ এলাকায় প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক পশু কোরবানি দেওয়া হয়। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে সৃষ্টি হয় বিশাল পরিমাণ বর্জ্য। পশুর রক্ত, নাড়িভুঁড়ি, চামড়া, খাদ্যবর্জ্য ও প্লাস্টিকের কারণে পরিবেশ দূষণ, দুর্গন্ধ এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ ও পুরোনো অবকাঠামো নির্ভর হওয়ায় এখানে বর্জ্য অপসারণ কাজ তুলনামূলক কঠিন। সংকীর্ণ রাস্তা, যানজট এবং অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে ঈদের সময় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়। পরিচ্ছন্ন ঈদ নগরী গঠনে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের  অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। তবুও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডিএসসিসি পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রুত বর্জ্য অপসারণে সফলতা দেখিয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন পরিচ্ছন্ন ঈদ নগরী গঠনে সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এর প্রশাসক এর পক্ষ থেকে ২০২৬ সালে কোরবানির পশুর বর্জ্য আট ঘণ্টার মধ্যে অপসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়াও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য বিশেষ পুরস্কারের ব্যবস্থাও থাকবে। এজন্য ঈদের আগে থেকেই বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ওয়ার্ডভিত্তিক টিম, অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং বিভিন্ন ধরনের যানবাহন প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যাতে রাজধানীর দক্ষিণাঞ্চল দ্রুত পরিচ্ছন্ন করা যায়। ডিএসসিসি বর্জ্য অপসারণে ডাম্প ট্রাক, মিনি ট্রাক, কম্প্যাক্টর, কন্টেইনার ক্যারিয়ার, পে-লোডার, বুলডোজার ও পানিবাহী গাড়িসহ নানা ধরনের ভারী যান ও যন্ত্রপাতি ব্যবহারের প্রস্তুতির তথ্য সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন।


ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো দ্রুত বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম। ঈদের দিন থেকেই প্রতিটি ওয়ার্ডে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা টিম কাজ শুরু করবে। অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী, বর্জ্যবাহী ট্রাক ও কনটেইনার প্রস্তুত রাখা হয়েছে যাতে ১২ ঘণ্টার মধ্যেই অধিকাংশ কোরবানির বর্জ্য অপসারণ করা যায়।

দক্ষিণ সিটির ৭৫টি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডভিত্তিক মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি সেলে কাউন্সিলর, পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ও স্বেচ্ছাসেবকরা সমন্বিতভাবে কাজ করবেন। কোথাও বর্জ্য জমে থাকলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য একটি কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুমও চালু করা হয়েছে।

প্রযুক্তিনির্ভর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ডিএসসিসি আরও জোর দিয়েছে। বর্জ্যবাহী যানবাহনে জিপিএস ট্র্যাকিং ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে, যাতে গাড়ির অবস্থান ও কার্যক্রম সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যায়। একই সঙ্গে অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে। নাগরিকরা মোবাইল অ্যাপ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে কোথাও বর্জ্য পড়ে থাকলে দ্রুত অভিযোগ জানাতে পারবেন।

পরিবেশ দূষণ কমাতে পশুর বর্জ্য আলাদা পলিব্যাগে রাখার জন্য নগরবাসীকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় বিনামূল্যে বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ড্রেনে বর্জ্য ফেলা রোধে মাইকিং ও সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুর্গন্ধ ও জীবাণু নিয়ন্ত্রণে ব্লিচিং পাউডার ও জীবাণুনাশক স্প্রে ব্যবহারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঈদের সময় বিশেষ স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন টিম মাঠে কাজ করবে।

তবে শুধু সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। পরিচ্ছন্ন ঈদ নগরী গঠনে নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণ জরুরি। নির্ধারিত স্থানে কোরবানি দেওয়া, বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে রাখা এবং প্লাস্টিক যত্রতত্র না ফেলা—এসব অভ্যাস নগর পরিচ্ছন্নতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সমন্বিত পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নাগরিক সচেতনতার মাধ্যমে এ বছর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ একটি পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য ঈদ নগরী গঠনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

সমাপনী কথা

পরিচ্ছন্ন ঈদ নগরী গঠন কেবল প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়; এটি নাগরিক সংস্কৃতি ও সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রতিফলন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন প্রযুক্তিনির্ভর, দ্রুত ও সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তবে টেকসই সফলতার জন্য প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা, আধুনিক প্রযুক্তি, শক্তিশালী নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা।

 
সরকার পরিচ্ছন্ন ঈদ নগরী গঠনে দ্রুত বর্জ্য অপসারণ, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সহায়তার মতো বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে এই উদ্যোগ সফল করতে নাগরিকদের সক্রিয় সহযোগিতা ও সচেতন অংশগ্রহণও সমানভাবে প্রয়োজন।

পরিচ্ছন্ন নগরী শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; এটি সুস্থ জীবন, নিরাপদ পরিবেশ এবং টেকসই নগর উন্নয়নেরও পূর্বশর্ত। তাই “আমার বর্জ্য, আমার দায়িত্ব” এই চেতনা থেকেই গড়ে উঠতে পারে একটি পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও মানবিক ঈদ নগরী।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, প্রবন্ধকার ও গবেষক ।

Kmhoque2023@gmail.com




« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »





আরও খবর


সর্বশেষ সংবাদ
⇒সর্বশেষ সব খবর...
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর: মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন জিটু
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : প্ল্যানার্স টাওয়ার, ১০তলা, ১৩/এ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামটর, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০, বাংলাদেশ।
ফোন: +৮৮-০২-৪১০৬৪১১১, ৪১০৬৪১১২, ৪১০৬৪১১৩, ৪১০৬৪১১৪, ফ্যাক্স: +৮৮-০২-৯৬১১৬০৪,হটলাইন : +৮৮-০১৯২৬৬৬৭০০৩-৪
ই-মেইল : pressgonokantho@gmail.com, videogonokantho@gmail.com, cvgonokantho@gmail.com, editorgonokantho@gmail.com, web : www.gonokantho.com