| শিরোনাম |
|
ভ্রূণের লিঙ্গ পরিচয় গোপন: হাইকোর্টের রায়ে মানবিক ও আইনি বিজয়ের নতুন দিগন্ত:
এডিএম মাহফুজুর রহমান দীপু
|
জন্মের আগেই কি নির্ধারিত হয়ে যাবে একটি শিশুর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি? এই মৌলিক প্রশ্নটিকে সামনে রেখে গর্ভস্থ সন্তানের লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশে হাইকোর্টের সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের বিচার বিভাগীয় ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আদালতের এই নির্দেশনা কেবল একটি আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি আমাদের ক্ষয়িষ্ণু সামাজিক মানসিকতার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী আইনি প্রতিবাদ।আমাদের সমাজবাস্তবতায় আজও অনেক পরিবারে ছেলে বা মেয়ে সন্তানকে ঘিরে বৈষম্যমূলক মানসিকতা বিদ্যমান। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে যে ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো আসবে: জেন্ডার সিলেক্টিভ অ্যাবোর্শন রোধ: কন্যা ভ্রূণ হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের পথ বন্ধ হবে, যা লিঙ্গীয় ভারসাম্য রক্ষায় অপরিহার্য। মায়ের মানসিক সুস্বাস্থ্য: গর্ভাবস্থায় সন্তান ছেলে হবে নাকি মেয়ে—এই নিয়ে পারিবারিক ও সামাজিক যে মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করা হয়, তা থেকে মুক্তি পাবেন গর্ভবতী মায়েরা। চিকিৎসা পেশার মর্যাদা: আলট্রাসনোগ্রামসহ আধুনিক প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ও অনৈতিক ব্যবহার বন্ধ হবে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য ‘সেবা’কে সমুন্নত রাখবে। আইনি ব্যবচ্ছেদ: সংবিধান যখন সুরক্ষাকবচ: এই রায়ের গভীরে তাকালে দেখা যায়, এটি আমাদের সংবিধানের মূল স্তম্ভগুলোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। ১. বৈষম্যহীনতার অঙ্গীকার: সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রকে সকল নাগরিকের সমান অধিকার এবং লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার নির্দেশ দেয়। জন্মের আগেই লিঙ্গ পরিচয়ের ভিত্তিতে কারো প্রতি অগ্রাধিকার বা অবজ্ঞা দেখানো এই সাংবিধানিক চেতনার পরিপন্থী। ২.জীবনধারনের অধিকার: সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক ব্যক্তির জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। ভ্রূণাবস্থায় একটি শিশুর বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। ৩.আইনি নীতি (Legal Doctrine): আদালত এখানে 'Parens Patriae' (রাষ্ট্র যখন অভিভাবক) এই নীতিটি প্রয়োগ করেছেন, যেখানে রাষ্ট্র বা আদালত এমন সব মানুষের অভিভাবক হয়ে দাঁড়ায় যারা নিজেদের সুরক্ষা দিতে অক্ষম—যেমন এই ক্ষেত্রে অনাগত শিশু। এই রায়ের মাধ্যমে আদালত প্রমাণ করেছেন যে, আইন কেবল অপরাধীর বিচার করে না, বরং এটি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের কারিগর হিসেবেও কাজ করে। লিঙ্গ পরিচয় গোপন রাখা মানে শিশুকে তার লিঙ্গ দিয়ে নয়, বরং তার সুস্থতা ও অস্তিত্ব দিয়ে গ্রহণ করা। পরিশেষে বলা যায়, অনাগত শিশুর পরিচয় থাকুক অজানাই, কেবল মানবিকতা আর ভালোবাসায় পূর্ণ হোক তার আগমনের প্রতিটি মুহূর্ত। উচ্চ আদালতের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে চিকিৎসক, অভিভাবক এবং রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে। তবেই আমরা এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারব, যেখানে একটি শিশুর প্রথম পরিচয় হবে সে একজন ‘মানুষ’। |