| শিরোনাম |
|
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় ৮ কোটি ৬০ লাখ টাকার বন্যায় আশ্রয় কেন্দ্র প্রকল্পে মাত্র ৪০টি কলাম নির্মাণ করেই কাজ ফেলে লাপাত্তা ঠিকাদার
মোঃ নুরুন্নবী মিয়া,উপজেলা প্রতিনিধি সুন্দরগঞ্জ
|
প্রায় এক বছর ধরে এভবেই পিলারগুলো দাড়িয়ে আছে গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্ উপজেলার কাপসিয়া ইউনিয়নের বানভাসী চরের মানুষের ভাগ্য।এ অবস্থায় হাজারো শ্রমিক মজুরি অনিশ্চয়তায় পড়ে চরম ভোগান্তিতে আছেন, আর আসন্ন বন্যায় বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ আরও ভয়াবহ হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দায়িত্বশীলদের গাফিলতি ও অবহেলার কারণেই রাষ্ট্রীয় এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প আজ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ভাটি বোচাগাড়ি গ্রামের পোড়ারচর এলাকায় নির্মাণাধীন এই দুর্যোগ আশ্রয় কেন্দ্র ঘিরেই তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা। প্রকল্প এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে নির্মাণসামগ্রী। কোথাও বাঁশ, কোথাও ইটের খোয়া, আবার কোথাও শাটারের তক্তা পড়ে আছে। পড়ে আছে মিক্সচার মেশিনও। টিউবওয়েলে ধরেছে মরিচা, শ্রমিকদের থাকার ঘরটিও ভেঙে গেছে। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় পুরো এলাকায় এক ধরনের পরিত্যক্ত চিত্র তৈরি হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, তারা বন্যার সময় গবাদিপশু, আসবাবপত্র ও পরিবার নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন। সেই কষ্ট লাঘবের আশায় ফসলি জমি ছেড়ে তারা আশ্রয় কেন্দ্রের জন্য জায়গা দিয়েছেন। কিন্তু বছরের পর বছর পার হলেও প্রকল্পটি বাস্তবে রূপ না নেওয়ায় এখন তারা হতাশ। তাদের অভিযোগ, জমি দিয়ে ফসল থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন, আবার আশ্রয় কেন্দ্রও হয়নি। শ্রমিক হিসেবে কাজ করেও অনেকেই পারিশ্রমিক পাননি। দায়িত্বশীলদের গাফিলতির কারণেই এ দুরবস্থা তৈরি হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। স্থানীয় বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. এন্তাজ আলী বলেন, ‘এ আশ্রয় কেন্দ্রের জন্য ১২ বিঘা জমি দেওয়া হয়েছে। আগে আমরা এসব জমিতে আবাদ করতাম, এখন বন্যার সময় এলাকার মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে—এই আশায় প্রকল্পে দিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে এবারও ৪০ থেকে ৫০ মণ ভুট্টা হয়েছে। তাহলে ১২ বিঘা জমিতে কতটা ফসল পাওয়া যেত, সেটা সহজেই বোঝা যায়। ২০২৪ সালের আগেই এসব জমি ছেড়ে দিয়েছি। একদিকে আবাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি, অন্যদিকে আশ্রয় কেন্দ্রও হয়নি। এতে আমরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছি। দ্রুত কাজ শেষ করার জোর দাবি জানাচ্ছি।’ আরেক সুবিধাভোগী মো. ফজলু মিয়া বলেন, ‘কাজটা শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের দিকে। ছয় মাস চলার পর থেকেই বন্ধ আছে। পিআইও, ঠিকাদার—কেউ আর আসেন না। ফোন দিলেও রিসিভ করেন না। কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা ৫-৬ মাস এখানে লেবার হিসেবে কাজ করেছি। চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পাওনা আছে, কিন্তু সেই টাকাও পাচ্ছি না। এখন আমরা চরম অসহায় অবস্থায় আছি, কে শুনবে আমাদের কথা।’ তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘ঠিকাদার অনিয়ম করবে এটা এক ধরনের বাস্তবতা হয়ে গেছে। কিন্তু পিআইও অফিসের লোকজন যদি দায়িত্বশীল হতো, তাহলে আজ এই অবস্থার সৃষ্টি হতো না। বরং তারা অনিয়মে ঠিকাদারকে সহযোগিতা করেছে বলেই প্রকল্পটি এভাবে পড়ে আছে।’ কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. হাফিজার রহমান জানান, ‘কাজটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। বন্যার সময় যদি বানভাসি মানুষ এখানে আশ্রয়ই নিতে না পারে, তাহলে এই জমি নেওয়ারই বা কী প্রয়োজন ছিল। দ্রুত কাজটি শেষ করার জন্য সরকারের কাছে আমরা জোরালোভাবে আহ্বান জানাচ্ছি।’ ওয়ার্ক অর্ডারের তারিখ এবং কাজ শেষ হওয়ার সময় সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য না দিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান উষাণ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘প্রকল্পের বরাদ্দ ৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা। কাজের মেয়াদ শেষ হয়েছে, এখন সময় বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। সেই অপেক্ষাতেই আছি।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পাওনার বিষয়টি সঠিক নয়। লেবারদের কিছু টাকা পাওনা থাকতে পারে, যা হেড মিস্ত্রির কাছে থাকতে পারে। আমার কাছে নয়।’ কাজটি তদারকির দায়িত্বে থাকা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মশিউর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে তার দপ্তরে কয়েকদিন গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। গাইবান্ধা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ প্রকল্প সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আমার কাছে নেই। কাজটি বন্ধ থাকার বিষয়টি জানি। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় কাজ বন্ধ আছে। আগামী অ্যাকটিং মিটিংয়ে মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।’ দুর্যোগ আশ্রয় কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই।’ তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন। |