| শিরোনাম |
|
নির্বাচনী হালচাল:
হবিগঞ্জ-১ আসনের সহজ সমীকরণ
হতে যাচ্ছে ধান-ঘোড়া-চেয়ারের ত্রিপক্ষীয় লড়াই
নিজস্ব প্রতিবেদক :
|
সালেহ আহমদ (স'লিপক)আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে আওয়ামীলীগের অনুপস্থিতিতে এক নতুন ও জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। শুরুর দিকে এই আসনে মূল আলোচনা ও লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী, স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী ও জামায়াত মনোনীত প্রার্থী। জোটগত সিদ্ধান্তের কারণে জামায়াত মনোনীত প্রার্থীর নমিনেশন প্রত্যাহার এবং অন্যান্য প্রার্থীদের দল এবং বিভিন্ন জোট গঠিত হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করায় সারা দেশের ন্যায় হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনেও উলটপালট হয়ে যাচ্ছে নির্বাচনী সমীকরণ। পাঠকদের সম্মুখে সেই সমীকরণ তুলে ধরার চেষ্টা করছি। হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকে ড. রেজা কিবরিয়া, স্বতন্ত্র প্রার্থী ঘোড়া প্রতীকে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সুজাত মিয়া, ১০ দলীয় জোট মনোনীত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রিকসা প্রতীকে প্রার্থী মাওলানা সিরাজুল ইসলাম মীরপুরী, গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট সমর্থিত বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (বাংলাদেশ জাসদ) এর মোটরগাড়ি/কার প্রতীকে কাজী তোফায়েল আহমেদ এবং বৃহত্তর সুন্নী জোট মনোনীত ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ এর চেয়ার প্রতীকে অধ্যক্ষ মুফতি মোহাম্মদ বদরুর রেজা সেলিম এই ৫জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নবীগঞ্জ-বাহুবলবাসী ভোটাররা এদের মধ্যে থেকে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারী বেছে নিবেন তাদের প্রতিনিধিকে। প্রার্থী হিসেবে এদের কাউকেই হেলা করার মতো নয়। বিভিন্ন দিক থেকে সব ক'জন প্রার্থীই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান গড়ে তুলেছেন। বিশেষ করে প্রার্থীরা জোট বা দল মনোনীত হওয়ায় ভোটাররা পড়েছেন সিদ্ধান্তহীনতায়; হিসেব কষছেন নানান সমীকরণে। পারিবারিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান সহ চায়ের আড্ডায় জমে উঠছে চুল-ছেঁড়া বিশ্লেষণ। সারা দেশের ন্যায় হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী উত্তাপ এখন চরমে! ২১ জানুয়ারী প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে পাল্টে গেছে সব হিসাব-নিকাশ। আওয়ামীলীগের অনুপস্থিতিতে মাঠ ফাঁকা মনে হলেও, লড়াইটা এখন আক্ষরিক অর্থেই ত্রিমুখী এক স্নায়ুযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। নির্বাচনের সমীকরণও রূপ নিয়েছে বেশ নাটকীয়তায়। আওয়ামীলীগ ও তাদের জোটের অনুপস্থিতিতে এই আসনে প্রধানত বিএনপি (ধানের শীষ), স্বতন্ত্র (ঘোড়া) এবং ইসলামিক ফ্রন্ট (চেয়ার) প্রার্থীদের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রার্থীদের বর্তমান অবস্থান ও সমীকরণ নিচে তুলে ধরা হলো- ড. রেজা কিবরিয়া (ধানের শীষ): বিএনপি মনোনীত এই হেভিওয়েট প্রার্থী বর্তমানে আলোচনার তুঙ্গে রয়েছেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার পুত্র হিসেবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি থাকায় তিনি শক্ত অবস্থানে আছেন। তবে বিএনপির স্থানীয় একটি অংশের মাঝে তাকে নিয়ে অসন্তোষ এবং দীর্ঘদিনের নেতাকর্মীদের উপেক্ষা করার অভিযোগ এবং শেখ সুজাত মিয়া বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় তার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপির একাংশ শেখ সুজাতের দিকে গেলেও আওয়ামীলীগ অনুসারীরা ভোট দিতে আসলে কিবরিয়াকেই ভোট দিবে তা নিশ্চিত করে বলা যায়। এছাড়া জাতীয় পার্টির প্রার্থী না থাকায় তারাও কিবরিয়াকে বেছে নেবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তাছাড়া নিজের এবং পিতার ইমেজও এখনে নগণ্য করে দেখা যাবে না। তৃণমূলের ভোট ধরে রাখাই এখন তার প্রধান চ্যালেঞ্জ। মূলকথা হচ্ছে, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার ছেলে এবং পেশায় একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী। তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে আছেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সুজাত মিয়া, যিনি ঘোড়া প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ছেন। ড. রেজা কিবরিয়া এর আগে ২০১৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে একই প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন। শেখ সুজাত মিয়া (ঘোড়া): জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সুজাত মিয়া দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে লড়ছেন। তিনি এই আসনের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে ড. রেজা কিবরিয়ার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী এবং জয়ের পথে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত ভোটব্যাংকের কারণে তিনি লড়াইয়ে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার ক্ষমতা রাখেন। বিএনপির বৃহৎ একটি অংশ তার দিকে ঝুকে আছে। এছাড়াও নিজের ব্যক্তি ইমেজতো আছেই। যতই সময় গড়াচ্ছে ব্যক্তিগত বিশাল ভোটব্যাংক, বিএনপির একাংশ ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে সুজাতের গ্রহণযোগ্যতা কিবরিয়ার কপালে ফেলে দিচ্ছে চিন্তার ভাজ। মূলকথা, হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীক নিয়ে লড়ছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সুজাত মিয়া। তিনি নির্বাচনী লড়াইয়ে অত্যন্ত আলোচিত অবস্থানে রয়েছেন। দলীয় মনোনয়ন না পাওয়া শেখ সুজাত মিয়া গত ২১ জানুয়ারী ২০২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ঘোড়া’ প্রতীক বরাদ্দ পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় বিএনপি তাকে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য পদসহ দলের প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে বহিষ্কার করেছে। প্রতীক বরাদ্দের পর শেখ সুজাত মিয়া নিজেকে এলাকায় অত্যন্ত জনপ্রিয় দাবি করে সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, তিনি এলাকার জনগণের সমর্থনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। কোনো কোনো স্থানীয় প্রতিবেদনে তাকে নির্বাচনী দৌড়ে বেশ সুবিধাজনক অবস্থায়ও দেখা যাচ্ছে। মাওলানা সিরাজুল ইসলাম মীরপুরী (রিকসা): ১০ দলীয় জোট মনোনীত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী হিসেবে তিনি ধর্মীয় ভোটব্যাংক ও তৃণমূল পর্যায়ে নিরবে কাজ করে যাচ্ছেন। বড় দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগে তিনিও চমক দেখাতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। জামায়াতের ভোট এবং কওমী ঘরনার ভোট তার মূল ব্যাংক। তাছাড়া আত্মীয় স্বজনরা সহ নিজের ইমেজও কিছুটা সহায়ক হবে বলে ভোটাররা মনে করেন। জামায়াত ও অন্যান্য ধর্মভিত্তিক কওমী ঘরনার দলগুলোর ভোট একীভূত হলে তিনিও হয়ে উঠতে পারেন ডার্ক হর্স। মূলকথা, হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনোনীত রিকশা প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা সিরাজুল ইসলাম নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয় রয়েছেন। তিনি এই আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং তাঁর নির্বাচনী কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তিনি নির্বাচনী এলাকায় জোরালোভাবে গণসংযোগ ও প্রচারণা চালাচ্ছেন। কওমী ঘরনার অনুসারীরা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন তাদের পছন্দের এ প্রার্থীকে মূল প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নিয়ে আসতে। কাজী তোফায়েল আহমেদ (মোটরগাড়ি/কার): জাতীয়গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট সমর্থিত বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (বাংলাদেশ জাসদ) মনোনীত প্রার্থী হিসেবে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বামপন্থী আদর্শের অনুসারী ও সীমিত প্রচারণার কারণে তার অবস্থান তুলনামূলকভাবে যদিও পিছিয়ে আছে, তবুও নিজের ইমেজ এবং বাম ঘরনার ভোট তার বাক্সেই পড়বে। মূলকথা, কাজী তোফায়েল আহমেদ দৈনিক দেশবার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক। গত ২১ জানুয়ারী ২০২৬ তারিখে হবিগঞ্জ জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে তার হাতে মোটরগাড়ি/কার প্রতীক তুলে দেয়ার পর থেকে তিনি অন্যান্য প্রার্থীদের মতো নবীগঞ্জ ও বাহুবল এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত রয়েছেন। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ভোটারদের আস্তা অর্জন করতে। অধ্যক্ষ মুফতি মোহাম্মদ বদরুর রেজা সেলিম (চেয়ার): বৃহত্তর সুন্নী জোট মনোনীত ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ এর এই প্রার্থী ইতিমধ্যেই তার নিজস্ব দলীয় অনুসারী এবং বৃহত্তর সুন্নী জোটের ভোট নিয়ে মূল লড়াইয়ে আসার মতো প্রভাব তৈরী করে নিয়েছেন। তাছাড়া আল্লামা সিরাজনগরী পীর সাহেবের ভক্ত মুরিদান, ভান্ডারী তরিকার ভক্ত মুরিদান এবং সুন্নী আক্বিদাভিত্তিক অরাজনৈতিক বিভিন্ন সংগঠন ও তরীকাপন্থী তথা আলিয়া অনুসারীদের ভোট তার বাক্সেই যাচ্ছে। এছাড়া ফুলতলী মছলকের ভোটও কেউ কেউ আকাইদগত কারণে চেয়ার মার্কায় পড়বে বলে ধারণা করছেন। ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ এর চেয়ারম্যান আল্লামা সৈয়দ বাহাদুর শাহ গণভোটে দেশবাসীকে না ভোট দেয়ার আহবান করায় আওয়ামী অনুসারীরা ভোট দিতে আসলে সংগত কারণেই তাদের ভোট চেয়ার প্রতীকে পড়বে। এছাড়া দলীয় চেয়ারম্যান পীরে তরিকত আল্লামা সৈয়দ বাহাদুর শাহ মুজাদ্দিদী এর ভক্ত-আশেকান ও মুরিদানদের ভোট, দ্বিধাদন্ধাক্রান্ত বিএনপির সুন্নীপন্থীদের ভোট, নিজ মাদরাসার ছাত্রদের অবিভাবক ও আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী শিক্ষকদের পরিবার-পরিজন, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ এর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হওয়ায় সিলেট বিভাগের অন্যান্য অঞ্চলের নেতাকর্মীদের আত্মীয়-স্বজন সহ নিজের ব্যক্তি ইমেজ কাজে লাগিয়ে বদরুর রেজা মূল প্রতিদ্বন্দ্বীতায় উঠে এসেছেন। তরুণদের তুরুপের তাস বদরুর রেজা শুধু তরুণ ভোটার নয়, নবীগঞ্জ ও বাহুবল উপজেলার বিশাল সুন্নী ভোটব্যাংক এর মাধ্যমে বড় ধরণের চমক দেখতে পারেন। শিক্ষিত সমাজ ও পরিবর্তনের প্রত্যাশীরা তার দিকে ঝুঁকলে সমীকরণ পুরোপুরি বদলে যাবে। মূলকথা হচ্ছে, অধ্যক্ষ মুফতি মোহাম্মদ বদরুর রেজা সেলিম একজন সুপরিচিত আলেম এবং এলাকায় বেশ কিছু মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত। তিনি মিষ্টি হুজুর নামে আলেমসমাজে সমাদৃত। তিনি এই আসনে অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলোচিত হচ্ছেন এবং স্থানীয় সমর্থকদের মাঝে তাকে নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। তিনি ২১ জানুয়ারী ২০২৬ তারিখে প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করেছেন। বাহুবল উপজেলার সন্তান হওয়ায় ওই এলাকায় তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক একটি শক্ত ভিত্তি রয়েছে এবং এরইমধ্যে তিনি সাধারণ মানুষের মাঝে 'আস্থার প্রতীক' হিসেবে পরিচিতি লাভ করছেন। হবিগঞ্জ-১ আসনে মূলত বিএনপির ড. রেজা কিবরিয়া (ধানের শীষ) এবং স্বতন্ত্র সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সুজাত মিয়া (ঘোড়া) এর মধ্যে প্রথম দিকে মূল লড়াইয়ের পূর্বাভাস থাকলেও এই শক্তিশালী দুই প্রার্থীর সাথে মুফতি বদরুর রেজা সেলিম মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাজির হয়েছেন। ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের নেতাকর্মী এবং সমর্থকসহ ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী ভোটারদের একটি নির্দিষ্ট অংশ তার প্রধান শক্তি। তবে এই ভোটব্যাংক জয়লাভের জন্য যথেষ্ট কি না, তা নির্ভর করবে সাধারণ ভোটারদের পছন্দের পরিবর্তনের ওপর। তার অবস্থান নবীগঞ্জ-বাহুবলের সাধারণ ভোটারদের মাঝে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে জয়লাভের দৌড়ে তিনি ড. রেজা কিবরিয়া এবং শেখ সুজাত মিয়ার মতো হেভিওয়েট প্রার্থীদের শক্ত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে মূলত বিএনপি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে মূল লড়াই হওয়ার পূর্বাভাস থাকলেও, বিএনপির ভোট বিভাজন এবং ইসলামধর্মীয় সুন্নীপন্থী ভোটাররা একীভূত হওয়ার ফলে মুফতি বদরুর রেজা সেলিম একটি উল্লেখযোগ্য ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারেন। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতির পূর্বাভাস ও সমীকরণগুলো বেশ জটিল ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে। বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে নির্বাচনের সম্ভাব্য সমীকরণগুলো আলোচনা করার চেষ্টা করছি। ভোট বিভাজনের ঝুঁকি ও বিএনপির দ্বিমুখী লড়াই: বিএনপির শক্তিশালী দুই নেতা (ড. রেজা কিবরিয়া ও শেখ সুজাত মিয়া) সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বীতা করায় ধানের শীষের ভোট দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। শেখ সুজাত মিয়ার শক্তিশালী তৃণমূল ভিত্তি এবং ড. রেজা কিবরিয়ার হাই-প্রোফাইল ইমেজের মধ্যে ভোটের ভাগাভাগি জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখবে। অন্যান্য শক্তিশালী পক্ষ: বৃহত্তর সুন্নী জোটের একক প্রার্থী হিসেবে ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ এর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ মুফতি মোহাম্মদ বদরুর রেজা সেলিমকে চেয়ার প্রতীকে সামনে এনেছে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগ নিতে বৃহত্তর সুন্নী জোট এখানে সজাগ। এছাড়া ১০ দলীয় জোট মনোনীত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রিকসা প্রতীকে প্রার্থী মাওলানা সিরাজুল ইসলাম মীরপুরী এবং গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট সমর্থিত বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (বাংলাদেশ জাসদ) এর মোটরগাড়ি/কার প্রতীকে কাজী তোফায়েল আহমেদও শক্ত অবস্থান নিয়ে নির্বাচনী মাঠে চষে বেড়াচ্ছেন। তাছাড়া জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদেরও এই আসনে রাজনৈতিক তৎপরতা রয়েছেন। বৃহত্তর সুন্নী জোটের একক অবস্থান: বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে ভোট ভাগ হলে বৃহত্তর সুন্নী জোটের প্রার্থী অধ্যক্ষ মুফতি মোহাম্মদ বদরুর রেজা সেলিম চেয়ার প্রতীক নিয়ে একটি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। আওয়ামীলীগের প্রভাব: শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামীলীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। ফলে এই আসনের বিশাল একটি ভোটব্যাংক (যারা আগে আওয়ামীলীগের প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরীকে ভোট দিত) এখন কার দিকে ঝুঁকবে, তা জয়ের অন্যতম নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। জামায়াতের অবস্থান: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. শাহজাহান আলী ২০ জানুয়ারী ২০২৬ তারিখে তার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এর ফলে জামায়াতের ভোটগুলো ১০ দলীয় জোট মনোনীত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রিকসা প্রতীকে প্রার্থী মাওলানা সিরাজুল ইসলাম মীরপুরী, বিএনপি নাকি স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে যাবে, তা নিয়েও চলছে নতুন জল্পনাকল্পনা। প্রবাসীদের প্রভাব: নবীগঞ্জ-বাহুবল এলাকার নির্বাচনে প্রবাসী, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য প্রবাসীদের বড় প্রভাব থাকে। তাদের সমর্থন ও অর্থনৈতিক প্রচারণা এই আসনের ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলেও অনেকেই ধারণা করছেন। জয়ের চাবিকাঠি: বৃহৎ সুন্নী জনতাই হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনের 'কিং মেকার'। অতীতে তাদের ভোট একতরফা কোনো বাক্সে না পড়ে বিভিন্নভাবে বিভক্ত হয়ে পড়লেও এবার তা বৃহত্তর সুন্নী জোটের প্রার্থী অধ্যক্ষ মুফতি মোহাম্মদ বদরুর রেজা সেলিম এর চেয়ার প্রতীকে একতরফা পড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে যদি বিএনপির ভোট রেজা কিবরিয়া ও শেখ সুজাতের লড়াইয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়, তবে ফায়দা লুটবে বৃহত্তর সুন্নী জোটের প্রার্থী মুফতি মোহাম্মদ বদরুর রেজা সেলিম এর চেয়ার। আমজনতা মনে করছেন, বৃহত্তর সুন্নী জোট যেহেতু গণভোটে "না" ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তাই আওয়ামীলীগও তাদেরকে ভোট দিবে। আর এতে করে একটা ত্রিপক্ষীয় প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ নির্বাচনী লড়াই হতে যাচ্ছে এ আসনে। সার্বিক সমীকরণ: আওয়ামীলীগ নির্বাচনে না থাকায় এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থী এ আসনে না থাকায় মূল ভোট এখন ধানের শীষ ও ঘোড়া প্রতীকের মধ্যে ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। শেখ সুজাত মিয়ার শক্ত অবস্থানের কারণে বিএনপির ভোট দুই ভাগে বিভক্ত হতে পারে, যার সুবিধা নিতে পারেন বৃহত্তর সুন্নী জোটের চেয়ার প্রতীকের প্রার্থী অধ্যক্ষ মুফতি মোহাম্মদ বদরুর রেজা সেলিম। সারসংক্ষেপে, হবিগঞ্জ-১ আসনে মূল লড়াই হচ্ছে ধানের শীষের প্রার্থী ড. রেজা কিবরিয়া এবং স্বতন্ত্র (ঘোড়া) প্রার্থী শেখ সুজাত মিয়ার মধ্যে। দলীয় শৃঙ্খলা বনাম ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার এই দ্বন্দ্বে সাধারণ ভোটারের নীরব ভোটই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী নির্ধারণ করবে। তবে সহজ কথায়, হবিগঞ্জ-১ আসনে জয়ের সমীকরণ নির্ভর করছে বিএনপির দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর মধ্যে ভোট ভাগাভাগি কতটা হয় এবং বৃহত্তর সুন্নী জোট বা অন্যান্য জোটের প্রার্থীরা সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগাতে পারেন তার ওপর। অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬-এ অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনের ফলাফল শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বিএনপির অভ্যন্তরীণ ঐক্য এবং সাধারণ ভোটারদের মেরুকরণের ওপর। লেখক: সালেহ আহমদ (স'লিপক) |