| শিরোনাম |
|
নির্বাচন সামনে রেখে অর্থনীতিতে নতুন প্রত্যাশা
গনকণ্ঠ ডেস্ক
|
![]() নির্বাচন সামনে রেখে অর্থনীতিতে নতুন প্রত্যাশা দীর্ঘদিন ধরে স্থবিরতার মধ্যে থাকা দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে এখনও কাঙ্ক্ষিত গতি ফেরেনি। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে—এমন প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবে বেসরকারি খাতে আস্থার সংকট পুরোপুরি কাটেনি। বিনিয়োগ বাড়েনি, কর্মসংস্থানও প্রত্যাশিত হারে সৃষ্টি হয়নি। বরং কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও চাপে পড়েছে। তবে আশার দিক হচ্ছে, আর মাত্র এক মাস পরই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় নির্বাচন। নতুন সরকার গঠনের সম্ভাবনাকে ঘিরে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হচ্ছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাত মনে করছে, নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে এবং অর্থনীতিতে গতি আসবে। অর্থনৈতিক সূচকগুলোতে ধীরে ধীরে কিছু স্থিতিশীলতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে, যার প্রভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও স্বস্তি ফিরেছে। যদিও শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ায় রিজার্ভে এই স্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। তবুও ডলারের দামের অস্থিরতা কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি এখনো বড় উদ্বেগের জায়গা। কয়েক মাস কমতির পর সর্বশেষ হিসাবে আবারও বেড়েছে সার্বিক মূল্যস্ফীতি। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমেনি। সব মিলিয়ে অর্থনীতি এখনো কঠিন সময় পার করছে, তবে সামনে নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষায় সবাই। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ‘অপেক্ষা করো ও দেখো’ নীতিতে থাকা অনেক বিনিয়োগকারী এখন ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত বদলাতে শুরু করেছেন। রাজনৈতিক সরকার এলে নীতিগত স্থিরতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুযোগ তৈরি হবে—এই বিশ্বাস থেকেই তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে, তবে এগুলোর গতি ছিল ধীর। ব্যাংক খাত সংস্কার অন্যতম বড় পদক্ষেপ ছিল। এর ফলে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি বেড়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভালো অবস্থায় গেছে এবং বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকানো গেছে। এটি একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। যদিও সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা করা গেছে, কিন্তু মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বিনিয়োগ আসছে না, কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হচ্ছে না, রাজস্ব আহরণ বাড়ছে না। তাই পরবর্তী নতুন সরকারকে বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে নিয়ে কাজ করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিনিয়োগকারীরা স্বল্প সময়ের জন্য বিনিয়োগ করেন না। ব্যবসায় রিটার্ন আসতে পাঁচ থেকে সাত বছর লেগে যায়। তাই তাঁরা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দেখতে চান। নির্বাচিত সরকার এলে বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটতে পারে।’ রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে স্বস্তি বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো এক বছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। সদ্যবিদায়ী বছরে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৩২.৮২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি। এই উচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ ডলারের বাজারে চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২.৪৪ বিলিয়ন ডলার এবং আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে নিট রিজার্ভ ২৭.৮৫ বিলিয়ন ডলার। ডলারের বাজারে অস্থিরতা কমায় আমদানিকারকদের জন্য এলসি খোলার ব্যয় কিছুটা কমেছে। ব্যাংক ও পুঁজিবাজারে আংশিক গতি দীর্ঘদিন পর পুঁজিবাজারেও কিছুটা প্রাণ ফিরছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সূচক ও লেনদেন বেড়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা বাড়ায় বাজারে স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত মিলছে। বিনিয়োগকারীদের আশা, নির্বাচনের পর নতুন সরকার বাজার সংস্কার ও তদারকি জোরদার করবে। পিএমআই সূচকে ধীর উন্নতি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) সূচক দাঁড়িয়েছে ৫৪.২, যা আগের মাসের তুলনায় সামান্য বেশি। কৃষি, উৎপাদন ও সেবা খাতে সম্প্রসারণ থাকলেও নির্মাণ খাত আবার সংকোচনের দিকে গেছে। তবে ভবিষ্যৎ ব্যবসা সূচকে সব খাতেই ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে, যা নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে অর্থনীতিতে গতি ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ইতিবাচক কিছু সূচক থাকলেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। টানা পাঁচ মাস ধরে রপ্তানি আয় কমছে। ডিসেম্বর মাসে রপ্তানি কমেছে ১৪.২৩ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং বিনিয়োগ প্রবাহ দুর্বল। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, জাতীয় নির্বাচনই এ বছরের সবচেয়ে বড় আশার জায়গা। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও ভোগ বাড়বে, যা অর্থনীতিকে নতুন গতি দেবে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘আমরা মনে করি, গণতন্ত্রে উত্তরণের বছরে নতুন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ঘাটতি কমানো, বিনিয়োগে আস্থা ফেরানো, ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং জ্বালানি সংকটের নিরসন। পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ ও ডলার সংকটের চাপে সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা হবে অন্যতম চ্যালেঞ্জ।’ |