| শিরোনাম |
|
আনোয়ার হোসেনের শখের রেডিও জাদুঘর
নিজস্ব প্রতিবেদক :
|
![]() আনোয়ার হোসেনের শখের রেডিও জাদুঘর একই সঙ্গে তিনি গড়ে তুলেছেন ব্যতিক্রমী এক রেডিওর জাদুঘর। আধুনিক প্রযুক্তির আগ্রাসনে রেডিও বা বেতার যন্ত্র আমাদের জীবন থেকে প্রায় বিলীন হওয়ার পথে। অথচ এক সময় মানুষের জীবনে মূল্যবান এক বিনোদন মাধ্যম ছিল এ রেডিও। রেডিও নিয়ে গ্রাম-বাংলায় এখনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কত শত গল্প! শুধু রেডিও শুনতে এক বাড়ির লোক আরেক বাড়িতে, এক গ্রামের লোক আরেক গ্রামে এসে হাজির হতেন এক সময়। শুনলে এখন অনেকের কাছে মনে হতে পারে গালগল্প। গ্রাম-বাংলা বা শহুরে জীবনের রেডিও শোনার দিনগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। প্রায় বিবর্ণ হয়ে আসা সেই মলিন স্মৃতির খানিকটা ধরে রাখতেই যেন আনোয়ার হোসেন আকন্দের প্রাণান্তকর এ চেষ্টা। আলাপচারিতায় আনোয়ার হোসেন আকন্দ বলেন, ‘প্রথমে আমি একটা নিউজিয়াম গড়ে তুলি। বাংলাদেশে আর কোথাও এমন নিউজিয়াম নেই। বিশ্বেও একটি বা দুটির বেশি আছে বলে আমার জানা নেই। আমার নিউজিয়ামে আছে ১৯৪৬-১৯৭২ সাল পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ের পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আরও আছে ১৮২৭ সালের মক্তব সাহিত্যের প্রথম ভাগ, ১৮৭৭ সালের শুভংকরী, ১৯৩৮ সালের ব্রিটিশ আমলের বই ‘পাঠান গৌরব’, ১৯০৬ সালের উপন্যাস ‘কাজী বাড়ীর পুকুর’। আছে বিজ্ঞান, বৃক্ষ, খেলাধুলা ও চিকিৎসা শাস্ত্রের বই। আছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ঘটনার ৭ হাজারের বেশি দুর্লভ আলোকচিত্র। এ ছাড়া আছে বিচিত্রা, রোববার, ছুটি, মুসলিম জাহানসহ বিভিন্ন সাময়িকী। আরও আছে শত বছর আগের বিয়ের দাওয়াতপত্র, স্কুলের মানপত্র, নির্বাচনি প্রতীক, অফিশিয়াল চিঠি, মহাজনদের টালি খাতা, ব্রিটিশ রাজা-মহারাজাদের ফরমান, ম্যাট্রিক পরীক্ষার সনদসহ আরও অনেক দুষ্প্রাপ্য দলিল।’ পত্রপত্রিকার পাতা কেটে সেগুলো নিজেই বাঁধাই করে বানিয়েছেন লাখ লাখ ক্লিপিং। তার সংগ্রহ করা তথ্যভান্ডার এখন হয়ে উঠেছে তথ্যের এক বাতিঘর। অনেক মূল্যবান সংবাদ বা তথ্য যা অন্য কোথাও পাওয়া মুশকিল, সেসব পাওয়া যায় তার এই নিউজিয়ামে। সংবাদ সংগ্রহের নেশা থেকেই এক সময় আগ্রহ সৃষ্টি হয় বিলুপ্ত প্রায় বেতার যন্ত্র বা রেডিও সংগ্রহের। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলছে তার এ রেডিও সংগ্রহের কাজ। রেডিও বা বেতার যন্ত্রের সংগ্রহ কবে থেকে শুরু করেছেন জানতে চাইলে আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বিভিন্ন বস্তু সংগ্রহের নেশা আমার অনেক দিন আগে থেকেই। জীবনের পুরোটা সময় আমি এসব সংগ্রহ করে কাটিয়েছি। তবে রেডিও সংগ্রহ শুরু করি ২০১৫ সাল থেকে। তার আগেও কিছু কিছু সংগ্রহ করেছি। তবে ২০১৫ সালের দিকে পুরোনো রেডিও বা বেতার যন্ত্র সংগ্রহে গুরুত্ব দিই। আমার হঠাৎ মনে হয়েছে ৫০ বা ১০০ বছর পর রেডিও নামে একটা বস্তু ছিল, আমাদের পরবর্র্তী প্রজন্ম সেটি বিশ্বাসই করবে না হয়তো। সুতরাং স্মৃতি হিসাবে পুরোনো রেডিও বা বেতার যন্ত্র রেখে যেতে চাই আমি। যাতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম রেডিওর ইতিহাস জানতে পারে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় এই রেডিও ছিল খবর শোনার প্রধান মাধ্যম। আমাদের গ্রামের বাড়ির আঙিনায় দু-তিন গ্রামের লোককে একসঙ্গে বসে খবর এবং অনুষ্ঠান শুনতে দেখেছি সে সময়। এসব স্মৃতি মনে পড়লে আবেগে আপ্লুত হই এখনো।’ কীভাবে সংগ্রহ করেছেন এসব বিলুপ্তপ্রায় বেতার যন্ত্র-এমন প্রশ্নের জবাবে আনোয়ার হোসেন আকন্দ বলেন, ‘আমি হেঁটে হেঁটে, মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে, চেয়ে চেয়ে অধিকাংশ রেডিও সংগ্রহ করেছি। এখন তো কেউ আর রেডিও শোনে না। তাই অনেকে চাওয়ামাত্র দিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া ভাঙারির দোকান, টিভি-রেডিও মেরামতের দোকানে গিয়েও অনেক রেডিও সংগ্রহ করেছি। কিছু কিছু টাকা দিয়ে কিনেও সংগ্রহ করেছি। বিশেষ করে আমার নিজের জেলা জামালপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম-এ তিন জেলা থেকেই আমি ঘুরে ঘুরে পুরোনো এসব রেডিও সংগ্রহ করেছি। আমার সংগ্রহে ৩ ইঞ্চি থেকে শুরু করে ২০ ইঞ্চি রেডিও পর্যন্ত আছে। অর্ধ ডজন রেডিও আছে কাঠের ফ্রেমের। এগুলো পাকিস্তান আমলের। রীতিমতো দুষ্প্রাপ্য। এখন কেউ কোথাও খুঁজে পাবেন না কাঠের ফ্রেমের এসব রেডিও। টেপ রেকর্ডারও আছে একাধিক। রেডিওর পাশাপাশি এই টেপ রেকর্ডার সংগ্রহ করেছি আমি। আমার সংগ্রহে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের রেডিও আছে। এর মধ্যে চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, ইন্ডিয়ান রেডিওই বেশি। আছে ন্যাশনাল, ন্যাশনাল প্যানাসনিক, ফিলিপস, রয়্যাল, ক্রাউন, ফোনিক্স, সনি, ডিংকার, ক্যাসিও ব্র্যান্ডের রেডিও। এসব বিখ্যাত কোম্পানি এখন আর রেডিও নির্মাণ করে না।’ আনোয়ার হোসেন আকন্দের সংগৃহীত এসব বিলুপ্তপ্রায় রেডিওর ভবিষ্যৎ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি চাই ইতিহাসের অংশ হিসাবে এসব থেকে যাক। আমার পরও কেউ না কেউ সংগ্রহে রাখুক। মানুষ তার ইতিহাস যেন জানতে পারে। জানতে পারে তার পূর্ব পুরুষের জীবনযাপনের ধরন। তাই সংগ্রহ করি এসব বিলুপ্ত বেতার যন্ত্র।’ |